রাতভর খেলার জন্য জেগে থাকা তারপর ফজরের নামাজে মসজিদ ফাঁকা

 



বিশ্বকাপের ফাইনাল, বড় কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ কিংবা বহুল প্রতীক্ষিত একটি খেলা এসবের জন্য মানুষের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। খেলা শুরু হবে গভীর রাতে, তবুও ঘুম নয়; বরং আগেভাগেই চা-কফির আয়োজন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা, আর টেলিভিশনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। রাত ১টা, ২টা, ৩টা কিংবা ভোর পর্যন্ত জেগে থাকতেও যেন কোনো ক্লান্তি নেই। প্রিয় দলের জন্য এই অপেক্ষাকে অনেকেই আনন্দের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন।

কিন্তু ঠিক সেই রাতের শেষ প্রহরে যখন চারদিকে ভেসে আসে ফজরের আজান, তখন দৃশ্যটি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। অনেক মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখা যায়। যে মানুষটি খেলার একটি মুহূর্তও মিস করতে চাননি, তিনিই হয়তো আল্লাহর ঘরে যাওয়ার সেই আগ্রহ দেখাতে পারেন না। এই দৃশ্য অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন জাগায়,আমাদের জীবনের প্রকৃত অগ্রাধিকার কি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে?

প্রশ্নটি কাউকে দোষী করার জন্য নয়, কাউকে ছোট করার জন্যও নয়। বরং এটি আমাদের প্রত্যেকের নিজের কাছে নিজের একটি প্রশ্ন। আমরা যাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তার জন্য সময় বের করি, ঘুম ত্যাগ করি, ক্লান্তি ভুলে যাই। তাহলে যে ইবাদত একজন মুসলিমের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, তার প্রতি কি আমাদের একই রকম ভালোবাসা ও গুরুত্ব থাকা উচিত নয়?


খেলাধুলা অবশ্যই মানুষের বিনোদনের একটি সুন্দর মাধ্যম। এতে আনন্দ আছে, আবেগ আছে, দেশ-বিদেশের কোটি মানুষের অংশগ্রহণ আছে। কিন্তু যখন দেখা যায় খেলার জন্য রাত জাগা সহজ, অথচ ইবাদতের জন্য সামান্য ত্যাগও কঠিন মনে হয় তখন বিষয়টি আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।

আজ যদি আমরা একটি ম্যাচের জন্য কয়েক ঘণ্টা নির্ঘুম থাকতে পারি, তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কিছুটা কষ্ট করতে আমাদের আপত্তি কেন? যদি একটি গোলের অপেক্ষায় রাত কেটে যায়, তবে প্রতিদিন ভোরে ভেসে আসা আজানের ডাক কি আমাদের হৃদয়কে একইভাবে স্পর্শ করে?

সমাজ পরিবর্তনের শুরু অন্যকে সমালোচনা করে নয়, নিজের ভেতর থেকেই। তাই এই প্রশ্নটি অন্য কারও জন্য নয়,আমার জন্য, আপনার জন্য, আমাদের সবার জন্য। আমরা কি এমন একটি জীবন গড়ে তুলছি, যেখানে বিনোদন আমাদের ব্যস্ত রাখে, কিন্তু ইবাদত আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে?

খেলার উচ্ছ্বাস একদিন শেষ হয়ে যাবে। ট্রফি বদলাবে, চ্যাম্পিয়ন বদলাবে, নতুন মৌসুম আসবে। কিন্তু প্রতিদিনের ফজরের আজান একইভাবে আমাদের ডাকতে থাকবে। সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার সৌভাগ্য যেন আমাদের সবার নসিব হয়।

আসুন, আমরা খেলার আনন্দ উপভোগ করি, কিন্তু সেই আনন্দ যেন আমাদের জীবনের প্রকৃত অগ্রাধিকারকে আড়াল না করে। কারণ একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার প্রিয় দল নয়, তার রবের প্রতি আনুগত্য।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url