উন্নয়ন বঞ্চিত বড়লেখার সীমান্তঘেষা জনপদ বোবারথল
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত |
ডেস্ক রিপোর্ট:
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহাবাজপুর ইউনিয়নের সীমান্তঘেষা পাহাড়ি জনপদ বোবারথল—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা হলেও বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনার বাইরে থেকে যাওয়া এই জনপদের আনুমানিক ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ আজও ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরের দুর্গম টিলা অঞ্চলে অবস্থিত বোবারথল। বোবারথল, কড়াইছড়া, উত্তর কড়াইছড়া, দক্ষিণ গান্দাই, মাঝ গান্দাই, গান্দাই পুঞ্জি, পেকুছড়া, ইসলামনগর, শান্তিনগর, কুশবানগর, বারোঘরি ও ষাটঘরি—মোট ১২টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এ জনপদ। শিক্ষা, চিকিৎসা, পানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক—সব ক্ষেত্রেই এখানকার মানুষ বৈষম্যের শিকার।
এলাকাজুড়ে নেই কোনো গভীর বা অগভীর নলকূপ। তাই স্থানীয়দের নির্ভর করতে হয় পাহাড়ি ঝর্ণা ও ছড়ার পানির ওপর। শুষ্ক মৌসুমে ছড়া শুকিয়ে গেলে গর্ত খুঁড়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়, যা জমতে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়।
বারোঘরি গ্রামের তাসলিমা বেগম (৩৫) বলেন, প্রতিদিন পাহাড় বেয়ে দিনে দুইবার পানি আনতে হয়। গর্তে পানি জমতে দেড়-দুই ঘণ্টা সময় লাগে। আরেকজন বাসিন্দা ইমন আহমদ জানান, এই পানি খাওয়ার উপযোগী না হলেও বিকল্প না থাকায় রান্না, গোসলসহ সব কাজে ব্যবহার করতে হয়। ফলে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত।
পুরো এলাকায় নেই কোনো উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে স্থানীয় দোকানদার ও বেসরকারি চিকিৎসকদের উপর নির্ভর করেন। গুরুতর রোগীদের উপজেলা সদরে নিতে হয় ১৪–১৫ কিলোমিটার দূরে। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে।
শহরের সঙ্গে নেই কোনো পাকা রাস্তা। কাদাযুক্ত টিলা পথ, ভাঙা কালভার্ট ও ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো পার হয়ে প্রতিদিন মানুষকে চলাচল করতে হয়। সচরাচর যানবাহনও চলে না। রোগীদের প্রায়ই খাটিয়া বা কাঁধে করে প্রধান সড়কে নিতে হয়। ফলে গর্ভবতী নারীসহ রোগীরা ভোগেন চরম দুর্ভোগে।
ইসলামনগর গ্রামের সেলিম উদ্দিন বলেন, জীবন পার করলাম পাহাড়ে কাটিয়ে, কিন্তু একটাও ভালো রাস্তা হলো না, নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক। পানি পান করতেও ভয় লাগে। সরকার বলে উন্নয়ন উন্নয়ন, কিন্তু সেই উন্নয়ন আমাদের কোথায়?
গ্রামে বিদ্যুৎ থাকলেও তা বেশিরভাগ সময়ই অচল। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট নেই বললেই চলে। ফলে শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এলাকায় তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মাদ্রাসা ও একটি হাই স্কুল থাকলেও প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। বর্ষায় রাস্তার কারণে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পশ্চিম পেকুছড়া গ্রামের আল ইমরান বলেন, “রাস্তার কারণে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে। কলেজ শিক্ষার্থী রাজিব উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন কলেজে যেতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। কৃষকরাও উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বোবারথল প্রবাসী ঐক্য পরিষদের কোষাধ্যক্ষ আব্দুল মুকিত জানান, এলাকাবাসী ও প্রবাসীদের অর্থায়নে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে কোনোভাবে কিছু রাস্তা সংস্কারের কাজ করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করেও কোনো সহায়তা বা অনুদান মেলেনি।
ইউপি সদস্য মইনুল হক বলেন, বোবারথল অবহেলিত একটি জনপদ। সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনায় এটি আজও উপেক্ষিত।
এলাকাবাসীর দাবি—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি ও যোগাযোগ খাতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। নইলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই জনপদের মানুষ উন্নয়নের আলো থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।
সূত্র: নয়া দিগন্ত
