তীব্র তাপদাহে বড়লেখা-জুড়ীতে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ, ১০-১২ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
তীব্র তাপদাহের মধ্যে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় দুই উপজজেলার সর্বত্র দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে। দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও বিদ্যুৎ থাকছে না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এতে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ।
সরেজমিনে বড়লেখা পৌর শহর, দক্ষিণভাগ, সুজানগর, তালিমপুর, নিজ বাহাদুরপুর, শাহবাজপুর, জায়ফরনগর, গোয়ালবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর আবার এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। আবার কোনো কোনো এলাকায় দিনে ও রাতে মিলিয়ে ০৮ থেকে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন চলে যাবে তা কেউ বলতে পারছেন না। ফলে প্রয়োজনীয় কাজের পরিকল্পনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফ্যান, কুলার ও পানির মোটর বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন গরমে অতিষ্ঠ হতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। অনেক এলাকায় রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতি, চার্জলাইট ও টর্চলাইটের আলোতেই পরিবারের সদস্যদের রাত কাটাতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফ্রিজনির্ভর দোকান, আইসক্রিম ও ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতা, মোবাইল সার্ভিসিং, কম্পিউটার দোকান, ফটোকপি ব্যবসা এবং ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক দোকানে ডিজিটাল লেনদেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত তরুণরাও নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও বেড়েছে। সামনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা থাকলেও রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চার্জ দিতে না পারায় অনলাইন ক্লাস, নোট সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারেও সমস্যা হচ্ছে।
বড়লেখা পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের ডিজিএম মো. খাইরুল বাকী বলেন,“উপজেলায় দৈনিক প্রায় ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৪ থেকে ১৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রয়োজনের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ দিয়েই পুরো এলাকায় সরবরাহ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করা ছাড়া আমাদের কোনো বিকল্প নেই।”
তিনি আরও বলেন, “জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে যে ঘাটতি রয়েছে, তার প্রভাব বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায় পড়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং ধীরে ধীরে লোডশেডিং কমে আসবে।”
বড়লেখা উপজেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাবেদ আহমদ বলেন,“প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে রাখা পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গ্রাহকরাও দোকানে বেশিক্ষণ থাকতে চান না। রাতেও ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে আমাদের একটাই দাবি,এই তীব্র গরমে লোডশেডিং যতটা সম্ভব কমানো হোক।”
জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন,“দিনে যেমন বিদ্যুৎ থাকে না, রাতেও একই অবস্থা। বৃদ্ধ মা-বাবা ও ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। অনেক সময় পুরো রাত জেগে থাকতে হয়। এই পরিস্থিতি থেকে দ্রুত মুক্তি চাই।” জুড়ী পৌরসভা এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম বলেন,“ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে ছেলে মেয়েদের পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অনেকেই রাতে পড়তে পারে না। বিদ্যুৎ সংকট দীর্ঘ হলে শিক্ষার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
স্থানীয়দের দাবি, তীব্র গরমের এই সময়ে অন্তত আবাসিক এলাকায় লোডশেডিং কমিয়ে মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়ে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি না পাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম। তবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায়ও পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং কমিয়ে এনে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
