সাদা পাথরে নজিরবিহীন লুটপাট: বিরানভূমিতে পর্যটন এলাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট:
লুটপাটের শুরু ও প্রশাসনের ভূমিকাহীনতা
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই শুরু হয় লাগামহীন লুটপাট। প্রকাশ্যে প্রশাসনের সামনেই সাদা পাথরের পাথর লুট করা হয়। পরে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর তৎপরতায় কিছুদিন বন্ধ থাকলেও গত মাসের শেষ দিকে লুটপাট আরও বেড়ে যায়।
সে সময় মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ঢলের সাথে বিপুল পাথর নেমে আসে, যা প্রতিদিন শত শত নৌকায় করে লুট হয়ে যায়। সোমবার পর্যন্ত এই লুট চললেও, দেশজুড়ে সমালোচনার কারণে মঙ্গলবার কাউকে পাথর তুলতে দেখা যায়নি। তবে গত ১৫ দিনেই সাদা পাথর বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সময়ে কয়েকশ কোটি টাকার পাথর, এমনকি নদীতীরের বালু ও মাটিও তুলে নেওয়া হয়েছে।
দিবালোকে কোটি টাকার পাথর চুরি
স্থানীয়রা জানান, আগে মাঝেমধ্যে রাতে পাথর চুরি হতো, এখন দিনের আলোতেই কয়েক কোটি টাকার পাথর লুট হচ্ছে। তাদের মতে, প্রশাসনের ব্যর্থতা ও মদদেই এই লুটপাট চলছে।
লুটপাটের নেপথ্য শক্তি
বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বারকি শ্রমিকরা পাথর উত্তোলন করে নদী ও আশপাশে মজুত রাখে, পরে ব্যবসায়ীরা কিনে নেন। শ্রমিকদের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আশ্রয়দাতারা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) মামলার কারণে পাথর কোয়ারির ইজারা ৪ বছর স্থগিত থাকে। ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সব পাথর কোয়ারি থেকে উত্তোলন স্থগিত করে। তবে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের সমর্থিত একটি মহল খোলাখুলিভাবে পাথর তুলেছে।
বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের সুযোগে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভোলাগঞ্জ ‘সাদা পাথর’ পর্যটনকেন্দ্র থেকে কোটি টাকার পাথর লুট হয়। শত শত ছোট-বড় নৌকায় এসব পাথর নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাহাব উদ্দিনের নাম প্রথম থেকেই উঠে আসে, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে সোমবার তার পদ স্থগিত করে কেন্দ্রীয় বিএনপি। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের আরও কয়েকজন নেতা লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন। জেলা ও মহানগর বিএনপির একাধিক নেতার বিরুদ্ধেও গুঞ্জন রয়েছে।
জাফলংয়েও ব্যাপক লুটপাট
৫ আগস্টের পর টানা দুই সপ্তাহ জাফলং জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন পিয়াইন ও গোয়াইন নদীর আশপাশ থেকে অন্তত এক কোটি ঘনফুট পাথর লুট হয়, যার আনুমানিক মূল্য শত কোটি টাকা।
এ ঘটনায় স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ১৮ আগস্ট গোয়াইনঘাট থানায় জিডি করেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা পৃথক মামলা করেন, যেখানে ১১৪ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শাহপরান এবং সাবেক কোষাধ্যক্ষ ও গোয়াইনঘাটের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপন। বিএনপি ইতিমধ্যেই তাদের বহিষ্কার করেছে। অধিকাংশ আসামিই বিএনপি নেতাকর্মী।
প্রশাসনের বক্তব্য
সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, “সাদা পাথরসহ সব কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা আছে। পাথর উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে, কিন্তু কোনোভাবেই লুট বন্ধ হচ্ছে না।”
