সিলেটে দুই দলের ৩৫ নেতার বিরুদ্ধে পাথর লুটের অভিযোগ


নিউজ ডেস্ক :

তদন্তে নেমেছে কেন্দ্রীয় বিএনপি, ব্যর্থতা মানতে নারাজ প্রশাসন; জামায়াত-এনসিপি বৈধ কোয়ারির পক্ষে, ১২ মামলা হলেও গ্রেপ্তার মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন

সিলেটে আলোচিত সাদাপাথর লুটপাটে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলেরও অন্তত ৩৫ জন নেতার নাম উঠে এসেছে। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্দেশনায় তদন্তে মাঠে নেমেছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবাবিষয়ক সহসম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া (জুয়েল)। তিনি গত মঙ্গলবার সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তদন্ত শেষে তিনি কেন্দ্রীয় দপ্তরে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেবেন।


সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “আমরা প্রশাসনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, যারা লুটপাটে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিএনপির কাউকে জড়িত পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইতিমধ্যে দলের দুজনের পদ স্থগিত করা হয়েছে এবং সহযোগী সংগঠনের আরও দুজনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”


সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন অভিযোগ করেন, “রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারা সেটি সঠিকভাবে করেননি। প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই আজ এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি নীতিমালা মেনে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবি আমরা বহুদিন ধরেই করে আসছি।”

অন্যদিকে এনসিপি সিলেট জেলার প্রধান সমন্বয়কারী নাজিম উদ্দিন শাহান বলেন, “আমাদের অঞ্চলের হাজারো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। পাথর কোয়ারি সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো যখন মানববন্ধন করে সব দলকে দাওয়াত দেয়, তখন আমরা সেখানে গিয়ে বলেছি—পরিবেশ রক্ষা করে বৈধ প্রক্রিয়ায় পাথর উত্তোলন করতে হবে। লুটপাট কিংবা চাঁদাবাজির পক্ষে আমরা কোনোভাবেই নই।”


এ ঘটনায় প্রশাসনের অবহেলার অভিযোগ উঠলেও কর্তৃপক্ষ তা মানতে নারাজ। সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “এখন অনেকেই অনেক কথা বলতে পারেন। আমরা সক্রিয় ছিলাম না নিষ্ক্রিয়—কী করেছি, সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। চাইলে আমি সব প্রমাণই দিয়ে দেব।”

সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ বলেন, “আমাদের কোনো অবহেলা ছিল না। আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়েছি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। কখনো অভিযান বন্ধ ছিল না। তবে মনে হচ্ছে, আমরা যে কার্যক্রম নিয়েছিলাম সেটি পর্যাপ্ত ছিল না। এজন্য এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে এখন আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছি। ভবিষ্যতে যাতে আর এমন না হয় সেজন্য প্রয়োজনে আরও বড় পরিসরে অভিযান চালানো হবে।”


পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের অভিযোগে ১২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৯১ জনকে। তবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাত্র একজনকে।

অন্যদিকে পুলিশের দায়ের করা ১৯ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৬০ জন। টাস্কফোর্সের অভিযানে আরও ৫২ জন ধরা পড়ে। এ ছাড়া বিএমডির দায়ের করা এক মামলায় আসামি করা হয়েছে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মানুষকে, অথচ গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ৫ জন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “দুর্বৃত্তদের হাত আসলে এতটা লম্বা নয়। দেশে এখন এক ধরনের অরাজক অবস্থা বিরাজ করছে। এই অরাজকতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি। কিন্তু প্রশাসন সব সময় দুর্বৃত্তায়নের পক্ষে অবস্থান নেয়। এ কারণেই তারা কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না।”


ঘটনার পর জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির গত রবিবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা না দিয়ে তারা আরও তিন দিনের সময় চেয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) পদ্মাসেন সিংহ বলেন, “তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের স্বার্থে আরও কিছু সময় প্রয়োজন। এজন্য জেলা প্রশাসকের কাছে তিন দিনের সময় বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে।”


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url